আজ মঙ্গলবার, ২৭শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ১১ই আগস্ট, ২০২০ ইং
Krishipedia.com

দেশি শোল মাছ চাষ

প্রকাশক:   প্রকাশকাল: ১৬ জুন, ২০২০   বিভাগ: দেশি মাছ চাষ  

শোল বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় মাছের মধ্যে অন্যতম। সুস্বাদু ও উপাদেয় এ মাছ দেশের সব শ্রেণীর মানুষের কাছে অত্যন্ত লােভনীয়। বিদেশী মাছ চাষ বৃদ্ধির কারণে দিন দিন সুস্বাদু শোল মাছ হ্রাস পাচ্ছে। দেশি শোল মাছের বৈশিষ্ট্য অতিরিক্ত শ্বাসনালি থাকায় পানি ছাড়াও বাতাস থেকে সরাসরি অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে। তাই মজা ও পচাপুকুর, ছােট ছােট ডােবা ইত্যাদি জলাশয়ের দূষিত পানিতেও শোল মাছের বেঁচে থাকতে কোনাে সমস্যা হয় না। ২/৩ কাঠার একটা পুকুর থেকে ১ টন পর্যন্ত মাছ উৎপাদন সম্ভব। পানি থেকে উত্তোলনের পর দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার কারণে জীবন্ত শোল মাছ বাজারজাত করা সম্ভব। এই মাছের দামও বাজারের অন্যান্য মাছের তুলনায় বেশি।

দেশী শোল মাছ

পুকুর প্রস্তুতকরণঃ

১ কাঠা থেকে ১ একর যে কোন আয়তনের পুকুরে দেশী শোল মাছ চাষ করা যায় তবে বানিজ্যিক ভাবে চাষের জন্য কমপক্ষে ১০ শতাংশ পুকুর হলে ভালো এবং গভীরতা ৮০ থেকে ১২০ সেন্টিমিটার (৩ থেকে ৫ ফুট) হওয়া ভালো। অধিক গভীরতা উৎপাদনের দিক থেকে অসুবিধাজনক। কেননা, শোল মাছকে শ্বাস নেয়ার জন্য সবসময় উপরে আসতে হয়। এতে অতিরিক্ত শক্তি ক্ষয়ের কারণে মাছের বৃদ্ধি প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট বিঘ্ন ঘটে। পাড়ের উচ্চতা অবশ্যই সর্বোচ্চ বন্যার লেভেল থেকে ৩০ সেন্টিমিটার (১ ফুট) উপরে রাখা আবশ্যক। এতে বৃষ্টির সময় মাছ বুকে হেঁটে বাইরে যেতে পারবে না। তদুপরি বাইরে থেকে সাপ, ব্যাঙ ইত্যাদি মৎস্যভুক প্রাণীও পুকুরে প্রবেশের কোনাে সুযােগ পাবে না। এ ছাড়া পুকুরের চারদিকের পাড়ের উপর ৩-৪ ফিট উঁচু নেটের বেড়া দেয়া বাঞ্ছনীয় যাতে শোল মাছ লাফিয়ে যেতে না পারে।

নেটসহ তৈরি পুকুর

চুন প্রয়ােগঃ পুকুরের তলদেশ শুকিয়ে হালকাভাবে চাষ দিয়ে তলার মাটির পিএই পরীক্ষা সাপেক্ষে প্রতি শতাংশে ১ থেকে ১.৫ কেজি হারে চুন প্রয়ােগ করতে হবে। চুন প্রয়ােগের পর পুকুরে ১৫ সেন্টিমিটার (৬ ইঞ্চি) পরিমাণ পানি ঢুকিয়ে সপ্তাহখানেক ধরে রাখা অত্যাবশ্যক।

জৈব সার প্রয়ােগঃ চুন প্রয়ােগের ৭ থেকে ১৫ দিন পর প্রতি শতাংশে ১০ কেজি হারে গােবর সার অথবা ৫ কেজি হারে মুরগির বিষ্ঠা ছিটিয়ে দিতে হবে।

অজৈব সার প্রয়ােগঃ জৈব সার প্রয়ােগের সাত দিন পর পানির উচ্চতা ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বজায় থাকা অবস্থায় প্রতি শতাংশে ২০০ গ্রাম ইউরিয়া, ১০০ গ্রাম টিএসপি ও ২০ গ্রাম এমওপি সার ব্যবহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, পানির রঙ বাদামি সবুজ, লালচে বাদামি, হালকা সবুজ, লালচে সবুজ অথবা সবুজ থাকাকালীন অজৈব সার (রাসায়নিক) প্রয়ােগের কোনাে প্রয়ােজন নেই।

পােনা বা ব্রুড মাছ মজুদঃ

মে থেকে জুন মাস শোল মাছের পােনা এবং এপ্রিল থেকে মে ব্রুড মাছ ছাড়ার যথার্থ সময় । ৫ থেকে ৮ সেন্টিমিটার দৈর্ঘের সুস্থ-সবল পােনা প্রতি বর্গমিটারে ৫০ থেকে ৮০টি হারে পুকুরে ছাড়া যেতে পারে। আর ব্রুড মাছ ২ কাঠায় ১ জোড়া (পুরুষ ও স্ত্রী মাছ) হিসেবে ছাড়া যেতে পারে। ব্রুড মাছ সাধারণত ছাড়ার ১ মাসের মধ্যে পোনা দিয়ে তাকে।একটি মা মাছ ৩ থেকে ২০ হাজার পর্যন্ত পোনা দিয়ে থাকে। ব্রুড মাছ একের অধিক জোড়া হলে আলাদা করে নেট দিয়ে ভাগ করে দিতে হবে এবং পর্যাপ্ত খাবার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শোল মাছ রাক্ষুসে এবং স্বগোত্রভুজী হওয়ায় পোনা খেয়ে ফেলে।

শোল মাছের পোনা

ব্রুড মাছ চেনার উপায়ঃ ব্রুড মাছের বয়স কমপক্ষে ১ বছর এবং ওজন ৮০০ গ্রাম থেকে ১২০০ হওয়া বাঞ্চনীয়। ব্রিডিং সিজনে সাধারাণত স্ত্রী মাছের পেটে ডিম দেখেই বুঝায় যায়। তবে নিশ্চিত উপায় হচ্ছে শোল মাছের নাভি কাপড় বা টিস্যু দিয়ে পরিষ্কার করে আলতো ভাবে ঘষতে থাকলে স্ত্রী মাছ তেকে হলুদ লালা, পুরুষ মাছ থেকে সাদা লালা বের হবে।

শোল মাছের খাদ্য ব্যবস্থাপনাঃ

প্রাকৃতিক পরিবেশে শোল মাছ মূলত জলাশয়ের ছোট মাছ, ব্যাঙাচি, পোকামাকড় খেয়ে জীবনধারণ করে। চাষের ক্ষেত্রেও এ জাতীয় খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। চাষের ক্ষেত্রে শুটকি মাছ, মাছের উচ্ছিষ্ট নাড়ি-ভুড়ি, চিংড়ির মাথা, ব্যাঙাচি, শামুকের মাংস, পিঁপড়ার ডিম, কেঁচো, মলা মাছ ইত্যাদি খাবার হিসেবে দেয়া যায়।

শোল মাছের খাবার

১ থেকে ৭ দিন বয়স পর্যন্ত শোল মাছের পোনাকে হাঁসের ডিম গুলিয়ে খেতে দিতে হবে। ৭ দিন থেকে ১ মাস পর্যন্ত মাছ সিদ্ধ, পিপড়ার ডিম, শুটকির গুড়া খেতে দিতে হবে। এরপর আস্তে আস্তে কাঁচা খাবারে অভ্যস্থ করাতে হবে। মাছের খাবার পাত্র/ঝুড়িতে করে নির্দিষ্ট স্থানে স্থানে দিলে বুঝা যায় মাছ খাচ্ছে কি খাচ্ছে না।

খাদ্যের প্রয়ােগমাত্রাঃ দেশী শোল মাছ তাদের শরীরের ওজনের ২ থেকে ৪ ভাগ খাবার খেয়ে থাকে। সে হিসেবে প্রতি কেজি শোল মাছ উৎপাদনে ২-৪ কেজি আমিষ জাতীয় খাদ্য লাগবে। দৈনিক খাদ্যের অর্ধেক সকালে এবং বাকি অর্ধেক বিকালে প্রয়ােগ করতে হবে।

রোগ ও চিকিৎসাঃ

দেশী শোল মাছ প্রাকৃতিক পরিবেশে বংশবিস্তার করে বিধায় এদের তেমন রোগ বালাই দেখা যায় না। শুধু মাত্র শীত কালে ক্ষত রোগ দেখা যায়। এর রোগের জন্য প্রতি শতাংশ হারে চুন প্রয়োগ করলে প্রতিকার পাওয়া যায়। এছাড়া নিকটস্থ মৎস কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।

শোল মাছের ক্ষত রোগ

মাছ সংগ্রহ এবং লাভের হিসাবঃ

উপরােক্ত পদ্ধতি মােতাবেক পুকুরে চাষকৃত দেশি শোল মাছের ওজন ১ বছরে ১ থেকে ১.৫ কেজি হয়ে থাকে। মাছের ওজন সাধারণত ৭০০ গ্রাম থেকে ১০০০ গ্রাম হলেই বাজারজাত করা যায়। তবে মাছ বাজার জাত করার ক্ষেত্রে সিজনের দিকে খেয়াল রাখা দরকার। কারণ সিজনে খাল-বিল থেকে পাওয়া শোল মাছ বাজারে আসে বলে দাম একটু কম পাওয়া যায়। প্রতি কেজি শোল মাছ বাজারে খুচরা ৫০০-৭০০ টাকা বিক্রি হয়। পাইকারি দাম যদি ৩০০ টাকা হয়। ১ হাজার পিস ১ কেজি ওজনের মাছ পুকুরে পাওয়া যায়। তাহলে দাম হবে ৩ লক্ষ টাকা। খরচ সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকা।

সর্বশেষ আপডেট: ১৬ জুন ২০২০, ৫:৫৮ পূর্বাহ্ণ

আরো পড়ুনঃ

বিভিন্ন শাকসবজির পুষ্টিগুন

শাকসবজিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও খনিজ পদার্থসহ অন্যান্য অনেক পুষ্টি উপাদান। অনেকেই খাদ্য এবং পুষ্টিকে একই মনে করেন। আসলে এটি ভুল ধারণা। কারণ খাদ্য পুষ্টিকর নাও হতে পারে, তবে...

ট্যাংকে মাছ চাষ পদ্ধতি: আরএএস (RAS) এবং বায়োফ্লক (Biofloc)

পৃথিবীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে খাবারের চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের পুষ্টি ও আমিষের চাহিদা পূরণে মৎস্য সম্পদের রয়েছে বিরাট ভূমিকা। খাদ্য উৎপাদনের মধ্যে মৎস্য উৎপাদন একটি অন্যতম লাভজনক পেশা। কিন্তু...

খাকি ক্যাম্পবেল হাঁস পালন পদ্ধতি A টু Z

যারা ডিম উৎপাদনের উদ্দেশ্যে হাঁস পালন করতে আগ্রহী তাদের কাছে ক্যাম্পবেল জাতই বেশি জনপ্রিয়। ইংল্যান্ডের এই সংকর জাতটির হাঁসের রং খাকি বলে এর নাম খাকি ক্যাম্পবেল। ক্যাম্পবেল নামক এক মহিলা...

Your email address will not be published.

ক্যালেন্ডার

আগষ্ট ২০২০
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« জুন    
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১