আজ মঙ্গলবার, ২৭শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ১১ই আগস্ট, ২০২০ ইং
Krishipedia.com

বাণিজ্যিক খরগোশ পালন পদ্ধতি

প্রকাশক:   প্রকাশকাল: ৯ জুলাই, ২০১৯   বিভাগ: খরগোশ পালন  

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার আমিষের চাহিদা মেটাতে আমাদের মাংস উৎপাদনের বিভিন্ন উপায় খুঁজে বের করতে হবে। “Micro-Livestock” হিসাবে পরিচিত খরগোশ মাংস উৎপাদনের একটি ভালো উৎস হতে পারে। আমাদের দেশে খরগোশ পালনের ভালো সুযোগ রয়েছে এবং বাণিজ্যিকভাবে খরগোশ পালন আয় এবং কর্মসংস্থানের ভালো সুযোগ হতে পারে।

খরগোশের জীবনযাপনের জন্য কম জায়গা এবং বেঁচে থাকার জন্য কম খাবার প্রয়োজন। অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় খরগোশের মাংসে প্রোটিন, এনার্জি, ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন এর পরিমাণ বেশি। কোলেস্টেরল, চর্বি এবং সোডিয়াম পরিমাণ অন্যান্য মাংসের চেয়ে কম। যা ডায়াবেটিকস রোগীদের জন্য আমিষের একটা বিকল্প।

খরগোশের মাংস খুবই সুস্বাদু, পুষ্টিকর এবং সব বয়স্ক মানুষের জন্য সহজে হজমযোগ্য। এবং খরগোশের মাংস গ্রহণের জন্য কোন ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা নেই। খরগোশ খুব দ্রুত বাড়ে এবং মহিলা খরগোশ প্রত্যেকবার ২ থেকে ৮ টি বাচ্চা প্রসব করে। তারা খুব কম মানের খাদ্য খেয়ে উন্নতমানের মাঙস উৎপাদন করে।

খরগোশ পালন শিক্ষিত বেকার মানুষ এবং ভূমিহীন কৃষকদের একটি বড় আয়ের উৎস হতে পারে। সুতরাং বাণিজ্যিক খরগোশ পালন খাদ্য , প্রোটিন এবং কর্মসংস্থানের জন্য ভালো একটি উৎস হতে পারে। এখানে আমরা খরগোশের বাণিজ্যিক সুবিধা এবং কিভাবে শুরু করায় যায় সে বিষয়ে আলোচনা করবো।

ছবিঃ খরগোশ, ইন্টারনেট থেকে

খরগোশ পালনে সুবিধাসমূহঃ
বাণিজ্যিক খরগোশ পালনে অনেক সুবিধা রয়েছে। খরগোশ পালনে প্রধান প্রধান সুবিধা গুলো নিম্নে দেওয়া হল।

১। খরগোশ খুব দ্রুত বর্ধনশীল প্রাণী।
২। তাদের খাদ্য রূপান্তর হার অন্যান্য প্রাণী চেয়ে ভাল।
৩। একটি মহিলা খরগোশ প্রত্যেকবার ২ থেকে ৮ টি বাচ্চা প্রসব করে।
৪। কম খরচে অল্প জায়গায় পালন করা যায়।
৫। উৎপাদন খরচ অন্যান্য বড় আকারের প্রাণী তুলনায় কম।
৬। খরগোশ মাংস খুব সুস্বাদু, পুষ্টিকর এবং সহজে হজমযোগ্য। সব বয়সের মানুষ কোনো সমস্যা ছাড়া খেতে পারেন।
৭। খরগোশের মাংস গ্রহণের জন্য কোন ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা নেই।
৮। মাংস উৎপাদন ক্ষেত্রে, পোল্ট্রির পরেই খরগোশের স্থান।
৯। রান্নাঘরে তরকারির বর্জ্য, ঘাস, গাছের পাতা ইত্যাদি খরগোশের প্রিয় খাবার। তাই কম খরচে পালন করা যায়।
১০। খরগোশ পালনে অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় শ্রম কম লাগে।

মানুষ সাধারণত পোষা প্রাণী হিসাবে খরগোশ পালন করে। কিন্তু এটির বাণিজ্যিক উৎপাদন আয় এবং কর্মসংস্থানের ভালো একটা উৎস হতে পারে। সারা বিশ্বে বার্ষিক মাংসের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন হাঁস, গরুর মাংস এবং শুয়োরের মাংস দ্বারা এই বিশাল চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বাণিজ্যিক খরগোশ উৎপাদন এই চাহিদা মেটাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই খরগোশ পালনের ব্যবসায়িক ভালো সুযোগ আছে।

 

খরগোশের খামার কিভাবে শুরু করবেন?
খরগোশ ছোট আকারের প্রাণী। সুতরাং বাণিজ্যিক খরগোশ পালন শুরু করা খুব সহজ। শুরু করার আগে একটি সঠিক ব্যবসায়িক পরিকল্পনা করুন। এখানে আমরা বাণিজ্যিক খরগোশ পালন শুরু করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলি বর্ণনা করছি।

 

খরগোশের জাত নির্বাচন
সারা বিশ্ব জুড়ে পাওয়া অনেক প্রজাতির খরগোশ আছে। ডার্ক গ্রে , ফক্স, ডাচ, নিউজিল্যান্ড হোয়াইট, নিউজিল্যান্ড ব্ল্যাক, নিউজিল্যান্ড রেড, বেলজিয়াম হোয়াইট ও চিনচিল্লা ইত্যাদি দ্রুত উৎপাদনশীল এবং জনপ্রিয় প্রজাতি। আপনি আপনার এলাকায় প্রাপ্যতা উপর নির্ভর করে যেকোন উৎপাদনশীল প্রজাতি নির্বাচন করতে পারেন।

ছবিঃ বিভিন্ন জাতের খরগোশ

সুস্থ খরগোশ চেনার উপায়
সুস্থসবল খরগোশ চেনার কতগুলো উপায় আছে তার মধ্যে কয়েকটি হল।
১। উজ্জ্বল, প্রশস্ত, এবং সতর্ক দৃষ্টির চোখ।
২। নরম, শুষ্ক, উজ্জ্বল ত্বক
৩। পরিষ্কার দাঁত ও নখ।
৪। চলাফেরায় চঞ্চল থাকবে

 

খরগোশ পালন পদ্ধতি
আপনি লিটার পদ্ধতি এবং খাঁচা পদ্ধতি দুইভাবে খরগোশ উৎপাদন শুরু করতে পারেন। এখানে আমরা এই দুই পদ্ধতি সম্পর্কে আরো বিস্তারিত বর্ণনা করছি।

লিটার পদ্ধতিঃ

আপনি যদি কয়েকটি খরগোশ পালন করতে চান তবে এই পদ্ধতিটি উপযুক্ত। পাকা মেঝে গভীর লিটার পদ্ধতির জন্য বেশি উপযুক্ত। ৪ থেকে ৫ ইঞ্চি গভীর তুষ, খড়, খড় বা কাঠ গুড়ো দিয়ে লিটার তৈরি করুন। এই পদ্ধতিতে, আপনি একটি ঘরে সর্বাধিক ৩০/৪০ টি খরগোশ রাখতে পারেন। পুরুষ খরগোশকে মহিলা থেকে পৃথক কক্ষে রাখুন। গভীর লিটার পদ্ধতিতে রোগের ঝুঁকি বেশি। এবং কখনও কখনও, এই পদ্ধতিতে খরগোশ নিয়ন্ত্রন করা খুব কঠিন বলে মনে হতে পারে। এ পদ্ধতিতে পুরুষ খরগোশ মারামারি করে একে অপরকে মারাত্মক আহতে করে ফেলে।

ছবিঃ লিটার পদ্ধতি

খাঁচা পদ্ধতিঃ
বাণিজ্যিক খরগোশ পালনের জন্য, খাঁচা পদ্ধতিটি সর্বোত্তম। এই পদ্ধতিতে খরগোশগুলি একটি খাঁচায় রাখা হয়, যা তারের বা লোহার প্লেটের দ্বারা তৈরি হয়। সর্বাধিক সংখ্যক খরগোশ উৎপাদন করার জন্য খাঁচা পদ্ধতিটি খুবই উপযোগী। প্রতিটি খাঁচার ভিতরে পর্যাপ্ত স্থান এবং প্রয়োজনীয় সুবিধা রাখুন। পুরুষ এবং মহিলা খরগোশ একে অপরের থেকে পৃথক রাখুন। প্রজনন সময়ের সময় তাদের একটি পৃথক খাঁচা মধ্যে একসঙ্গে রাখুন। খাঁচার মধ্যে বাচ্চা দেয়ার জন্য আলাদা প্রসূতি ঘরের বা বক্সের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

ছবিঃ খাঁচা পদ্ধতিতে খরগোশ পালন

খাঁচাতে খরগোশের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা
ক) পূর্ণবয়স্ক পুরুষ খরগোশের জন্য ৪ বর্গফুট
খ) পূর্ণবয়স্ক মা খরগোশের জন্য ৬ বর্গফুট (প্রসূতি ঘর সহ)
গ) বাচ্চা খরগোশের জন্য ১.৫ বর্গফুট

পূর্ণবয়স্ক খরগোশের খাঁচা ১.৫ ফুট লম্বা, ১.৫ ফুট চওড়া এবং ১.৫ উঁচু হওয়া উচিত। এতে বাড়ন্ত দুইটি খরগোশ প্রতিপালন করা যাবে।
বড় আকারের খরগোশের জন্য ৩ ফুট লম্বা, ১.৫ ফুট চওড়া এবং ১.৫ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট খাঁচা উপযোগী।

 

খরগোশের খাদ্য ব্যবস্থাপনা
বয়স ও প্রজাতি ভেদে খরগোশের খাদ্য গ্রহণ ও পুষ্টির প্রয়োজনীয়তা ভিন্ন হয়। একটি বয়স্ক খরগোশের খাদ্যে পুষ্টির জন্য প্রোটিন ১৭-১৮%, আঁশ ১৪%, খনিজ ৭% ও বিপাকীয় শক্তি ২৭০০ কিলোক্যালরী/ কেজি হওয়া প্রয়োজন। একটি বয়স্ক খরগোশের জন্য প্রতিদিন ১৩০-১৪৫ গ্রাম, দুগ্ধবতী খরগোশের জন্য প্রতিদিন ২৫০-৩০০ গ্রাম ও বাড়ন্ত খরগোশের জন্য প্রতিদিন ৯০ গ্রাম খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। সবুজ শাক সবজি, মৌসুম ভিত্তিক শাক সবজি, গাজর, মুলা, শশা, কুমড়া, এবং তরকারির উচ্ছিষ্টাংশ ইত্যাদি সাধারণত খরগোশের খাদ্য। এছাড়াও গম, ভূট্টা, ছোলা এসব দানাদার খাদ্যও খরগোশের পছন্দ। তবে, বাণিজ্যিকভাবে খরগোশ পালনের জন্য পোল্ট্রির জন্য প্রস্তুতকৃত খাদ্য খরগোশের রেশন হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

খরগোশ ঘাস খাচ্ছে

খরগোশের প্রজনন ব্যবস্থাপনা
খরগোশ সাধারণত ৫-৬ মাস বয়সে পরিণত এবং প্রথম প্রজনন উপযোগী হয় । ভাল সুস্থসবল তরুণ খরগোশ ছাড়া প্রজনন করা ঠিক নয়। কখনো বাচ্চা দেয়নি এবং সুস্থ এমন খরগোশ ব্রিডিং বা প্রজননের জন্য নির্বাচন করা উত্তম। পুরুষ খরগোশের বয়স এক বছর হওয়ার আগে তাকে ব্রিডিং না করানো ভালো। গর্ভবতী খরগোশ ২৮-৩৪ দিনের (জাতভেদে) মধ্যে বাচ্চা দেয়। একটি স্ত্রী খরগোশ প্রতিবার ২ থেকে ৮ টি বাচ্চা দেয়। খরগোশ বাচ্চা জন্মের পর সাধারণত ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত বাচ্চাকে দুধ খাওয়ায়। একবার বাচ্চা দেয়ার ২ থেকে ৩ মাস পর আবার বাচ্চা দিতে পারে। প্রজনন সময়ে খরগোশের জন্য ব্রিডিং বক্স বা প্রসূতি ঘরের ব্যবস্থা করতে হবে বাচ্চা দেয়ার জন্য। বাচ্চা প্রসবের কাছাকাছি সময়ে খরগোশ নিজের গায়ের লোম ছিড়ে বাসা বানানোর চেষ্টা করে। তখন খরগোশের খাাঁচায় খড়ো কুটো ছিটিয়ে দিতে হবে যাতে খরগোশ সেগুলো দিয়ে বাসা বানাতে পারে।

ছবিঃ ব্রিডিং বক্সে খরগোশ

গর্ভবতী খরগোশ চেনার উপায়
একটি স্ত্রী খরগোশের গর্ভাবস্থা জানার কয়েকটি উপায় আছে। যদি এই পদ্ধতি গুলো শতভাগ নিশ্চিত কোন উপায় না।
১। মেটিং বা মিলনের ১০-১৫ পর স্ত্রী খরগোশের পেটের পিছনের দিকে বলের মত গোল পিন্ড অনুভুত হওয়া।
২। পুরুষ খরগোশ কাছে ঘেষতে চাইলে স্ত্রী খরগোশটি আক্রমন করে বা বিভিন্ন শব্দ করে।
৩। ওজন এবং খাওয়ার পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।
৪। আচরণ দেখেও চেনা যায়। প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসলে স্ত্রী খরগোশ খড় কুটো এবং নিচের গায়ের লোম দিয়ে বাসা বানানোর চেষ্টা করে।

 

খরগোশ বাজারজাতকরণ
কিছু এলাকায় খরগোশ বাজারজাতকরণ তেমন সহজ নয়। তাই সবচেয়ে ভালো হচ্ছে শুরু করার আগে বাজারজাতকরণের একটি পরিকল্পনা করা। আপনি স্থানীয় বাজার বা নিকটবর্তী শহরে আপনার বাজার তৈরি করতে পারেন। পোষা প্রাণী বিক্রি করে এমন হকারদের মাধ্যমেও বাজারজাত করতে পারেন। বর্তমানে ই-কমার্সের যুগে অনলাইনে আপনি আপনার উৎপাদিত খরগোশ বিক্রি করতে পারেন। বিভিন্ন হোটেল এবং রেসটুরেন্ট বিক্রি পরিকল্পনা করতে পারেন। সর্বোপরি দেশের অন্যান্য খরগোশ চাষীদের সাথে যোগাযোগ রেখে আপনি আপনার উৎপাদিত খরগোশ সহজে বাজারজাত করতে পারেন।

 

সঠিক যত্ন এবং পরিচালনার মাধ্যমে আপনি আপনার খরগোশ চাষের ব্যবসায় সর্বোচ্চ লাভ করতে পারেন। সর্বদা আপনার খরগোশের ভাল যত্ন নিতে চেষ্টা করুন। তাদের পুষ্টিকর খাবার খাওয়ান, তাদের ঘর পরিষ্কার রাখুন এবং শুরু করার সময় ভালো প্রজাতির ক্রয় করুন। তাহলে আপনি আপনার খরগোশ চাষ ব্যবসাকে অত্যন্ত লাভজনক করতে পারবেন।

সর্বশেষ আপডেট: ৯ জুলাই ২০১৯, ৮:০৯ পূর্বাহ্ণ

আরো পড়ুনঃ

বাজরিগার পাখি পালন পদ্ধতি

বাজরিগার প্রধানত অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল অঞ্চলে বনাঞ্চলের পাখি। তাছাড়াও তাস্মেনিয়া এবং আশপাশের কয়েকটি দেশেও এই পাখি দেখতে পাওয়া যায়। বনে বাস করে এমন বাজরিগার লম্বায় প্রায় ৬.৫ থেকে...

ট্যাংকে মাছ চাষ পদ্ধতি: আরএএস (RAS) এবং বায়োফ্লক (Biofloc)

পৃথিবীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে খাবারের চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের পুষ্টি ও আমিষের চাহিদা পূরণে মৎস্য সম্পদের রয়েছে বিরাট ভূমিকা। খাদ্য উৎপাদনের মধ্যে মৎস্য উৎপাদন একটি অন্যতম লাভজনক পেশা। কিন্তু...

খাকি ক্যাম্পবেল হাঁস পালন পদ্ধতি A টু Z

যারা ডিম উৎপাদনের উদ্দেশ্যে হাঁস পালন করতে আগ্রহী তাদের কাছে ক্যাম্পবেল জাতই বেশি জনপ্রিয়। ইংল্যান্ডের এই সংকর জাতটির হাঁসের রং খাকি বলে এর নাম খাকি ক্যাম্পবেল। ক্যাম্পবেল নামক এক মহিলা...

১ thought on “বাণিজ্যিক খরগোশ পালন পদ্ধতি”

Your email address will not be published.

ক্যালেন্ডার

আগষ্ট ২০২০
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« জুন    
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১